Tuesday, November 26, 2019

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণ।

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষন বাংলায় বর্ণনা করা হয়েছে। শুক্রবার ৯ জিলহজ্ব ১০ হিজরি সনে হজ্জের সময় আরাফা ময়দানে দুপুরের পর হযরত মুহাম্মদ (স) লক্ষাধিক সাহাবীর সমাবেশে এ ঐতিহাসিক ভাষন দেন হামদ ও সানার পর তিনি বলেন: হে মানুষ! তোমরা আমার কথা শোনো.এর পর এই স্থানে তোমাদের সাথে আর একত্রিত হতে পারবো কিনা জানিনা! হে মানুষ আল্লাহ বলেন.হে মানবজাতি তোমাদেরকে আমি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, এবং তোমাদেরকে সমাজ ও গোত্রে ভাগ করে দিয়েছি. যেন তোমরা পরস্পরের পরিচয় জানতে পার,অতএব শুনে রাখো মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। আরবের ওপর কোনো অনারবের_অনারবের উপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই । তেমনি সাদার উপর কালোর বা কালোর উপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই । তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশী সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী,যে আল্লাহকে ভালবাসে। হে মানুষ ! শুনে রাখো অন্ধকার যুগের সকল বিষয় ও প্রথা আজ থেকে বিলুপ্ত হলো.জাহিলি যুগের রক্তের দাবিও রহিত করা হলো। হে মানুষ ! শুনে রাখো,অপরাধের দায়িত্ব কেবল অপরাধীর ওপরই বর্তায় । পিতা তার পুত্রের জন্যে আর পুত্র তার পিতার অপরাধের জন্য দায়ী নয়। হে মানুষ! তোমাদের রক্ত তোমাদের সম্মান,তোমাদের সম্পদ পরস্পরের জন্য চিরস্থায়ী ভাবে হারাম অর্থাৎ পবিত্র ও নিরাপদ করা হলো যেমন আজকের এই মাস এই শহর সকলের জন্য পবিত্র ও নিরাপদ। হে মানুষ! তোমরা ঈর্ষা ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দুরে থাকবে ঈর্ষা ও হিংসা মানুষের সকল সৎগুনকে ধ্বংস করে। হে মানুষ! নারীদের সম্পর্কে আমি তোমাদের সতর্ক করে দিচ্ছি,তাদের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করোনা, তাদের উপর যেমন তোমাদের অধিকার রয়েছে তেমনি তোমাদের উপর তাদেরও অধিকার রয়েছে সুতরাং তাদের কল্যাণের দিকে সবসময় খেয়াল রেখো। হে মানুষ! অধীনস্থদের সম্পর্কে সতর্ক হও.তোমরা নিজেরা যা খাবে তাদেরও তা খাওয়াবে.নিজেরা যা পরবে তাদেরও তা পরাবে,শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করবে । হে মানুষ! বিশ্বাসী সেই ব্যক্তি যার হাত ও মুখ থেকে অন্যের সম্মান,ধন ও প্রাণ নিরাপদ, সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে অন্যের জন্যেও তাই পছন্দ করে । হে মানুষ! বিশ্বাসীরা পরস্পরের ভাই,সাবধান ! তোমরা একজন আরেকজনকে হত্যা করার মতো কুফরি কাজে লিপ্ত হয়ো না। হে মানুষ! শুনে রাখো আজ হতে বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব বা কৌলিনপ্রথা বিলুপ্ত করা হলো কুলীন বা শ্রেষ্ঠ সেই যে বিশ্বাসী ও মানুষের উপকার করে। হে মানুষ! ঋণ অবশ্যই ফেরত দিতে হবে.বিশ্বস্ততার সাথে প্রত্যেকের আমানত রক্ষা করতে হবে,কারো সম্পত্তি সে যদি স্বেচ্ছায় না দেয়,তবে তা অপর কারো জন্য হালাল নয় । তোমরা কেউ দুর্বলের উপর অবিচার করো না। হে মানুষ! জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও মূল্যবান.জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক নর-নারীর জন্য ফরয-কারন জ্ঞান মানুষকে সঠিক পথ দেখায় । জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে তোমরা চীনে যাও। হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রভুর ইবাদত করবে,নামায কায়েম করবে.যাকাত আদায় করবে,রোজা রাখবে হজ্ব করবে আর সংঘবদ্ধ ভাবে নেতাকে অনুসরণ করবে তাহলে তোমরা জান্নাতে দাখিল হতে পারবে। হে মানুষ! শুনে রাখো একজন কুশ্রী-কদাকার ব্যক্তিও যদি তোমাদের নেতা মনোনীত হয়.যতদিন পর্যন্ত সে আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের পরিচালিত করবে,ততদিন পর্যন্ত তার আনুগত্য করা তোমাদের অবশ্য কর্তব্য। হে মানুষ ! শুনে রাখো আমার পর আর কোনো নবী নেই । হে মানুষ আমি তোমাদের কাছে দুটি আলোকবর্তিকা রেখে যাচ্ছি.যতদিন তোমরা এ দুটো অনুসরণ করবে ততদিন তোমরা সত্য পথে থাকবে এর একটি হলো-আল্লাহর কিতাব.দ্বিতীয়টি হলো-আমার জীবন-দৃষ্টান্ত। হে মানুষ! তোমরা কখনোই ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না- কারন অতীতে বহু জাতি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির কারনে ধ্বংস হয়ে গেছে। হে মানুষ! প্রত্যেককেই শেষ বিচারের দিনে সকল কাজের হিসেব দিতে হবে । অতএব, সাবধান হও। হে মানুষ! তোমরা যারা এখানে হাজির আছো,আমার এই বাণীকে সবার কাছে পৌঁছে দিও {এরপর তিনি জনতার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন,হে মানুষ আমি কি তোমাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছি,সকলে সমস্বরে জবাব দিলো : হ্যাঁ এরপর নবীজী (স:) বললেন হে আল্লাহ তুমি সাক্ষী থাকো! আমি আমার সকল দায়িত্ব পালন করেছি। হে আল্লাহ আমাদের কে ইসলাম বুঝে মুসলমান হওয়ার তৌফিক দিন! আমিন।

Tuesday, October 22, 2019

যেসব আমলে জান্নাতে প্রাসাদ তৈরি হয়।

যেসব আমলে জান্নাতে প্রাসাদ তৈরি হয় দুনিয়াতে এমন কিছু নেক আমল রয়েছে- যেগুলোর প্রতিপালনে আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে অনিন্দ্যসুন্দর প্রাসাদ তৈরি করে দেন। প্রাসাদগুলো কুদরতি নেয়ামতে ভরা। এসব সৎকর্ম মোটেও আয়াসসাধ্য নয়, বরং সহজসাধ্য। একটু মনোযোগী হলেই তা সম্ভব। নির্মাণ শ্রমিকগণ জান্নাতে সৎকর্মশীলদের জন্য প্রাসাদ তৈরি করার কাজে মশগুল থাকেন। মাঝেমধ্যে তারা কাজ বন্ধ রাখেন। তাদের জিজ্ঞাসা করা হয় কেন কাজ বন্ধ রেখেছ? তারা জবাব দেয় নিচে নেক আমল বন্ধ রয়েছে। নেক আমল শুরু হলে আমরা কাজে ধরব। তাই দুনিয়ার সময়গুলো হেলায়-ফেলায় নষ্ট না করে এসব আমলের মাধ্যমে জান্নাতে প্রাসাদ নির্মাণের জোগান দেওয়াই মুমিনের কর্তব্য। নিচে এমন কিছু আমল সম্পর্কে আলোকপাত করা হচ্ছে- হাদিসে এসেছেÑ যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি বিধানের প্রত্যাশায় মসজিদ তৈরি করে দেন, ১০ বার সুরা ইখলাস তিলাওয়াত করেন আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাতে একটি, যে ২০ বার পড়বে তার জন্য ২টি এবং যে ৩০ বার পড়বে তার জন্য ৩টি রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করে দেবেন। এ কথা শুনে হজরত ওমর (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! জান্নাতে তো আমাদের অনেক প্রাসাদ থাকবে। মহানবী (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালার দয়া ও মেহেরবানি আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত। (বুখারি : ১/৫৫৪; মুসলিম : ২৪; দারেমি : ২/৪৫৯; সুয়ুতি, বুদুরুস সাফেরাহ : ১৮১৯) দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। পরকালে নামাজিদের পুরস্কারে ভূষিত করবেন। আর কিছু নামাজ আছে যেগুলো মহানবী (সা.) নিয়মিত গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করতেন। ইসলামী পরিভাষায় এগুলো ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদা’ নামে অভিহিত। এসব নামাজ আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য হাসিলের মাধ্যম। আরও কিছু নামাজ আছে যেগুলো ফরজ নয়, সুন্নাতে মুয়াক্কাদাও নয়। পড়লে সওয়াব, না পড়লে গুনাহ নেই। এগুলোকে বলা হয় ‘নফল’। এ নামাজগুলো বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ও বরকতময়। মহানবী (সা.)-এর ভাষ্যমতে যে ব্যক্তি দিন-রাতে ১২ রাকাআত নামাজ আদায় করেন আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে তার জন্য একটি প্রাসাদ তৈরি করে দেবেন। ফজরের নামাজ শেষে সূর্য কিছু দূর ওঠার পর যে নফল নামাজ আদায় করা হয় তা ‘সালাতুদ দোহা’ বা চাশতের নামাজ নামে পরিচিত। যে ব্যক্তি ১২ রাকাত চাশতের নামাজ আদায় করবেন তাকে জান্নাতে স্বর্ণের তৈরি একটি প্রাসাদ দেওয়া হবে। মাগরিব ও এশার নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে নফল নামাজের নাম ‘সালাতুল আওয়াবিন’। যে ব্যক্তি ১০ বা ২০ রাকাত আওয়াবিনের নামাজ আদায় করবেন তিনি জান্নাতে একটি প্রাসাদ প্রাপ্ত হবেন। (মুসনাদে আহমদ : ৬/৩২৭; নাসায়ি : ৩/২৬২; মুসতাদারাক : ১/৩১১; ইবনে খুজায়মা : ১১৮৮; তিরমিজি : ৪৭৩; ইবন মাজাহ : ১৩৭৩, ১৩৮০; কানযুল উম্মাল : ১৯৪২৬; ইবনে হিব্বান : ৪৪৬) রমজানে রোজা পালন করা ফরজ। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সিয়াম সাধকদের জীবনের সব পাপ মোচন করে দেবেন এবং পরকালে অফুরন্ত নেয়ামত দান করবেন। কিছু রোজা আছে নফল যেগুলো পালন করলে বিস্ময়কর ফলাফল মেলে। যে ব্যক্তি রমজানে রোজা রাখেন, তার প্রতিটি সিজদায় ১৫শ নেকি আমলনামায় লিপিবদ্ধ করা হয় এবং জান্নাতে রক্তিম নীলকান্তমণি বা সবুজ গোমেদ পাথর দিয়ে তৈরি একটি প্রাসাদ তার জন্য প্রস্তুত রাখা হবে। যে ব্যক্তি বুধ, বৃহস্পতিবার ও জুমার দিন রোজা রাখেন আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে এমন একটি প্রাসাদ হস্তান্তর করবেন, যা তার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত। (আল বুদুরুস সাফেরাহ : ১৮১৫, ১৮২৯; মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ৩/১৪৩; আত-তারগিব আত তারহিব : ২/১২৬)। আরও নেক আমল আছে যেগুলো পালন করলে জান্নাতে রাজপ্রাসাদ পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে। যে ব্যক্তি নফল রোজা রাখেন, জানাজায় শরিক হন, অসুস্থ মানুষকে দেখতে যান, মিসকিনদের অন্ন জোগান, ফরজ নামাজের কাতার সোজা রাখেন এবং কাতারের শূন্যস্থান পূরণ করে নেন, মিথ্যা ছেড়ে দেন, ঝগড়া বিবাদ পরিহার করেন, উত্তম চরিত্র গ্রহণ করেন, বৃহস্পতিবার রাতে অথবা জুমার দিন সুরা দোখান তেলাওয়াত করেন; এসব আমলের বিনিময়ে জান্নাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং একটি প্রাসাদ তাকে দেওয়া হবে। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ : ৩/১৬৩; ইবনে মাজাহ : ৯৯৫; আল বুদুরুস সাফেরাহ : ১৮১৭, ১৮২৬) মহানবী (সা.) বলেন, যারা ঈমান আনবেন, মুসলমান হবেন এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করবেন তাদের জন্য জান্নাতের নিম্নস্তরে একটি, মধ্যস্তরে একটি এবং উচ্চস্তরে একটি প্রাসাদ তৈরি করা হবে। আমি মুহাম্মদ (সা.) তার জিম্মাদারী নিলাম (সুনান নাসায়ি : ৬/২১; তাবারানি : ১৮/৩১১)। হাটবাজার ও শপিংমলে প্রবেশ করে নিম্নোক্ত দোয়া পড়েন আল্লাহ তায়ালা তার আমালনামায় এক লাখ নেকি লিপিবদ্ধ করেন, এক লাখ পাপ মার্জনা করেন এবং জান্নাতে রাজপ্রাসাদ তৈরি হয়ে যায়। দোয়াটি হচ্ছেÑ আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলক ওয়া লাহুল হামদ, ইউহয়ি ওয়া ইউমিত, ওয়া হুয়া হাইউন লা ইয়ামুত বিয়াদিহিল খায়ের, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।’ (তিরমিজি : ৩৪২৫; ইবনে মাজাহ : ২২৩৫) ঈমানদার কোনো ব্যক্তির সন্তান যখন মারা যায়, ফেশেতাদের ডেকে আল্লাহ তায়ালা জানতে চান, আমার বান্দারা কী বলেছে? ফেরেশতাগণ জবাব দেবেন, তারা মন্দ কিছু বলেনি বরং আপনার প্রশংসা করেছে এবং ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়েছে। আল্লাহ তায়ালা তাদের হুকুম দেন তাদের জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করো এবং তার নাম দাও ‘বায়তুল হামদ’। মৃতব্যক্তির জন্য যারা কবর খনন করেন তারাও প্রাসাদ পাবেন। (আবু দাউদ তায়ালাসি : ৫০৮; কানযুল উম্মাল : ৪৩৫৭০)

Saturday, October 19, 2019

মানুষ মৃত্যূর পর করণীয়। ব্যক্তির প্রতি সমাজের দায়িত্ব

মৃত ব্যক্তির প্রতি সমাজের দায়িত্ব মৃত ব্যক্তির প্রতি সমাজের দায়িত্ব মানুষ মাত্রই মরণশীল, কেউ চিরকাল বেঁচে থাকে না এবং মৃত্যু নির্ধারিত। কে কোথায় মারা যাবে আগেভাগে জানার সুযোগ নেই। যিনি পৃথিবী থেকে বিদায় হয়ে যাচ্ছেন তার প্রতি সমাজের সদস্যদের দায়িত্ব ও করণীয় রয়েছে। এ দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য বা অবহেলা প্রদর্শন করা পাপ ও অপরাধ। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে চোখ বন্ধ করে দেওয়া এবং চাদর দিয়ে পুরো দেহ ঢেকে দেওয়া ইসলামের বিধান। আপনজনের বিচ্ছেদে ব্যথাতুর হওয়া এবং কান্না করার অনুমতি আছে। তবে চিৎকার, গড়াগড়ি ও পোশাক-পরিচ্ছদ ছিঁড়ে ফেলা অনুমোদিত নয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তদীয় শিশুপুত্র ইবরাহিমের মৃত্যুতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘হে ইবরাহিম! তোমার বিচ্ছেদে আমরা শোকাতুর। ’ বুখারি। মৃত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব গোসল, কাফন পরানো, কবর খনন ও দাফনের ব্যবস্থা করা সওয়াবের কাজ। এটা ব্যষ্টিক ও সমষ্টিক দায়িত্ব। শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে গোসল করালে গোসল প্রদানকারীদের জীবনের সব গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। গোসল করানোর সময় শারীরিক কোনো ত্রুটি দেখা গেলে গোসল প্রদানকারীরা যদি তা গোপন করে রাখেন, আল্লাহ তাদের জীবনের পাপ ৪০ বার মাফ করে দেবেন। কাফনের কাপড় কেউ সরবরাহ করলে বিনিময়ে তাকে জান্নাতে সবুজ বর্ণের রেশমি কাপড় প্রদান করা হবে। যারা কবর খনন করে দেন, তাদের জন্য জান্নাতে প্রাসাদ তৈরি করে দেওয়া হবে। মৃত ব্যক্তিকে গালি দেওয়া ও তার দোষচর্চা ও সমালোচনা করা নিষেধ। তার সদ্গুণাবলি স্মরণ করার নির্দেশনা রয়েছে রিয়াদুস সালেহীন। মৃত ব্যক্তির জানাজার মিছিলে যুক্ত হওয়া, জানাজার নামাজ আদায় করা ও দাফনে শরিক হওয়া বিরাট পুণ্যের কাজ। জানাজা নামাজে অধিক মানুষের উপস্থিতি শুভলক্ষণ হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্যে এমন ৪০ ব্যক্তি যদি থাকেন যারা শিরক করেননি, তারা যদি মাগফিরাতের দোয়া করেন, আল্লাহ মৃত ব্যক্তির পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। মুসলিম। সওয়াবের প্রত্যাশা নিয়ে কোনো ব্যক্তি যদি জানাজার শোভাযাত্রায় শরিক হয়, জানাজার নামাজ আদায় করে, দাফন শেষ হওয়া অবধি কবরস্থানে অবস্থান করে তাহলে দুই ‘কিরাত’ পরিমাণ সওয়াব প্রদান করা হয়। আর যদি দাফনের আগে কেবল জানাজার নামাজ আদায় করে ফিরে আসে, এক ‘কিরাত’ পরিমাণ সওয়াব মিলবে। ওহুদ পর্বতমালার সমান পরিমাপকে ‘কিরাত’ বলা হয়। রিয়াদুস সালেহীন। যে ব্যক্তি মারা গেল তার যদি কোনো ঋণ থাকে তা আদায়ের ব্যবস্থা করা ওয়ারিশদের জন্য জরুরি। ঋণ পরের হক। আল্লাহ পরের হক মাফ করেন না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় ঋণগ্রস্ত এক ব্যক্তির জানাজার নামাজ পড়াতে অস্বীকৃতি জানান। হজরত আলী (রা.) নিজের তহবিল থেকে আদায়ের প্রতিশ্রুতি দিলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজে ইমামতি করেন। কর্জ আদায় না হওয়া পর্যন্ত জান্নাত বা জাহান্নামে যাওয়ার ফয়সালা স্থগিত রাখা হয়। তিরমিজি। দাফন করার পর তাড়াহুড়া করে ঘরে ফিরে না এসে কবরস্থানে অবস্থান করে কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া-দরুদ ও জিকির-আজকারে মশগুল থাকা এবং মাগফিরাত কামনা করা শরিয়তের হুকুম। হজরত আমর ইবন আস (রা.) বলেন, ‘আমাকে দাফন করার পর তোমরা কবরের পাশে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে মাগফিরাত কামনা করবে যতক্ষণ একটি উট জবাই করে বণ্টন করতে সময় লাগে। ’ মুসলিম।

Saturday, October 12, 2019

প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার ১১টি অসাধারণ স্বাস্থ্য উপকারিতা

প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার ১১টি অসাধারণ স্বাস্থ্য উপকারিতা নামাজ হল ইসলাম ধর্মের প্রধান উপাসনাকর্ম। প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যক। কিন্তু অনেকেই জানেন না নামাজ সাস্থের জন্য অনেক উপকারী। নামাজ পড়ার মাধ্যমে আমাদের শরীরের বেশকিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নাড়াচাড়া হয় যা এক প্রকার ব্যায়াম। এই ব্যায়াম স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারি। চলুন জেনে নেই নামাজ পড়ার ১১টি স্বাস্থ্য গত উপকারিতা সম্পর্কে: ১। নামাজে যখন সিজদা করা হয় তখন আমাদের মস্তিস্কে রক্ত দ্রুত প্রবাহিত হয়। ফলে আমাদের স্মৃতি শক্তি অনেকবৃদ্ধি পায়। ২। নামাজের যখন আমরা দাড়াই তখন আমাদের চোখ জায়নামাজের সামনের ঠিক একটি কেন্দ্রে স্থির অবস্থানে থাকে ফলে মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। ৩। নামাজের মাধ্যমের আমাদের শরীরের একটি ব্যায়াম সাধিত হয়। এটি এমন একটি ব্যায়াম যা ছোট বড় সবাই করতে পারে। ৪। নামাজের মাধ্যমে আমাদের মনের অসাধারন পরিবর্তন আসে। ৫। নামাজ সকল মানুষের দেহের কাঠামো বজায় রাখে। ফলে শারীরিক বিকলঙ্গতা লোপ পায়। ৬। নামাজ মানুষের ত্বক পরিষ্কার রাখে যেমন ওজুর সময় আমাদের দেহের মূল্যবান অংশগুলো পরিষ্কার করা হয় এর ফলে বিভিন্ন প্রকার জীবানু হতে আমরা সুরক্ষিত থাকি। ৭। নামাজে ওজুর সময় মুখমন্ডল ৩ বার ধৌত করার ফল আমাদের মুখের ত্বক উজ্জল হয় এবং মুখের দাগ কম দেখা যায়। ৮। ওজুর সময় মুখমন্ডল যেভাবে পরিস্কার করা হয় তাতে আমাদের মুখে একপ্রকার মেসেস তৈরি হয় ফলে আমাদের মুখের রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং বলিরেখা কমে যায়। ৯। কিশোর বয়সে নামাজ আদায় করলে মন পবিত্র থাকে এর ফলে নানা প্রকার অসামাজিক কাজ সে বিরত থাকে। ১০। নামাজ আদায় করলে মানুষের জীবনি শক্তি বৃদ্ধি পায়। ১১। কেবল মাত্র নামাজের মাধ্যমেই চোখের নিয়ম মত যত্ন নেওয়া হয়। ফলে অধিকাংশ নামাজ আদায় কারী মানুষের দৃষ্টি শক্তি বজায় থাকে।

Sunday, August 11, 2019

ঈদ-উল-আজহা বা কুরবানির ঈদের নামাজের নিয়ম।

#ঈদ_মোবারক #ঈদের_নামাজের_নিয়ম ঈদ-উল-আজহা বা কুরবানির ঈদ। ত্যাগ ও উৎসর্গের ঈদ হলো কুরবানি। প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ এ ঈদ পালিত হয়। সে হিসেবে আগামীকাল ১২ আগষ্ট, ১০ জিলহজ পবিত্র কুরবানির ঈদ অনুষ্ঠিত হবে। বছরে দুইবার ঈদের নামাজ পড়তে হয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে অনেকেই ঈদের নামাজের নিয়মগুলো ভুলে যায়। তাই মুসলিম উম্মাহর সুবিধার্থে ঈদের নামাজ পড়ার নিয়মগুলো তুলে ধরা হলো- >> ঈদের নামাজ দুই রাকাআত। যা আদায় করা ওয়াজিব এবং তা জামাআতে আদায় করতে হয়। >> ঈদের দুই রাকাআত নামাজে অতিরিক্ত ছয় তাকবির দিতে হয়ে। #প্রথম_রাকাআত আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে কিবলামুখী হয়ে ঈদ-উল-আজহার দুই রাকাআত ওয়াজিব নামাজ ছয় তাকবিরের সাথে ইমামে পিছনে আদায় করছি বলে নিয়ত বাঁধতে হয়। প্রথমেই- তাকবিরে তাহরিমা- ‘আল্লাহু আকবার’ বলে নিয়ত বাধবেন। ইমাম ও মুসল্লিরা নিয়ত বাধার পর ছানা অর্থাৎ এ দোয়াটি পড়বে- উচ্চারণ : সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা ঝাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুক। তারপর ইমামের উচ্চস্বরে তাকবির বলার সঙ্গে সঙ্গে মুসল্লিরাও তাকবির বলবেন। প্রথম ও দ্বিতীয় তাকবির বলার সময় উভয় হাত কান বরাবর ওঠিয়ে ছেড়ে দিবেন। তৃতীয় তাকবিরের সময় উভয় হাত কান বরাবর ওঠিয়ে না ছেড়ে হাত বাধবেন। অপঃপর ইমাম সাহেব সুরা ফাতিহা এবং অন্য সুরা মিলিয়ে রুকু, সিজদা করবেন; মুসল্লিরাও ইমামের সঙ্গ রুকু সিজদা করবেন। #দ্বিতীয়_রাকাআত ইমাম সাহেব দ্বিতীয় রাকাআতে সুরা ফাতিহা ও অন্য সুরা মিলানোর পর রুকুতে যাওয়ার পূর্বে অতিরিক্ত তিন তাকবির প্রথম রাকাআতের মতোই আদায় করবেন। অতপর রুকু-সিজদা করার পর অন্যান্য নামাজের মতোই সালাম ফিরানোর মাধ্যমে নামাজ সম্পন্ন করবেন। এ নিয়মে ঈদ-উল-ফিতরও আদায় করা হয়। উভয় ঈদের আগে পরে কোনো নফল বা সুন্নত নামাজ নেই। এমনকি ঈদের নামাজের জন্য কোনো আজান ও ইক্বামাতেরও প্রয়োজন হয় না। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সুন্দরভাবে ঈদের নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Friday, April 19, 2019

শবে বরাতের তাৎপর্য

শবে বরাতের তাৎপর্য যাদের ধারণা রয়েছে যে, শবেবরাত এবং পনেরই শা’বান রাতের কোন অস্তিত্ব, কোন হাকিকত, ফযিলত এবং কোনরূপ বিশেষত্ব নেই, তারা যেন শবেবরাতের গুরুত্ব ও ফযিলত সম্পর্কে সিহাসিত্তার বিশ্বস্ত কিতাব জামে তিরমিযির ২য় খÐ ৭৩৯নং হাদিস খুলে দেখেন। তাদের জন্য উচিৎ হল এ সম্পর্কে জানা, হাদিসের কিতাবসমূহ খুলে দেখা এবং অজ্ঞতা বশতঃ মিথ্যা ফতওয়াবাজী করার পূর্বে এ বিষয়ে সঠিক জ্ঞান লাভ করার জন্য উস্তাদদের শরণাপন্ন হওয়া। ইমাম তিরমিযি (র.) পনেরই শাবান রাতের ফযিলত সম্পর্কে পরিচ্ছদ ঠিক করেছেন এবং শিরোনামও ঠিক করেছেন পনেরই শাবান রাত। এই শিরোনামের সাথে এ সম্পর্কে হাদিস বর্ণনা করেছেন যার বর্ণনাকারণী হলেন উম্মুল মু’মিনিন হযরত আয়েশা (রা.) এবং তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন হযরত উরওয়াহ (রা.)। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন যে, আমি একদা রাত্রিবেলায় রাসূলে মকবুল (সা.) কে হারিয়ে ফেলি, তখন আমি হুজুর (সা.) এর তালাশে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে পড়ি, যখন আমি বের হলাম তখন নবীজী (সা.)কে জান্নাতুল বাকীতে আকাশের দিকে মাথা মোবারক উত্তোলন অবস্থায় পাই। হুজুর (সা.) আমাকে দেখে ইরশাদ করতে লাগলেন, হে আয়েশা! তুমি কি এই বিষয়ে ভয় করছ যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর জুলুম করবেন? হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি ধারণা করছিলাম যে সম্ভবতঃ আপনি আপনার অপর কোন বিবি মুহতারামার ঘরে তাশরিফ নিয়ে গেছেন। তখন আল্লাহর রাসূল ইরশাদ করলেন, হে আয়েশা! নিশ্চিয়ই এটি শাবান মাসের পনেরই রাত। এই রাতে আল্লাহতায়ালা এক বিশেষ শানের সাথে দুনিয়ার আকাশের দিকে অবতরণ করেন এবং বনী কলব গোত্রের ছাগল গুলোর গায়ে যত সংখ্যক লোম আছে এর থেকে বেশি সংখ্যক গুনাহগার বান্দাহগণকে ক্ষমা করে দেন। (মুসনাদে আহমদ) এই হাদিস শরীফ থেকে দু’টি বিষয় প্রমাণিত হলো, একটি হল, ইমাম তিরমিযি (র.) পনেরই শাবান রাতের শিরোনামে পূর্ণ অধ্যায় ঠিক করা, অন্যটি হল আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) হতে হুজুর (সা.) এর সুন্নাত এর বর্ণনা করা যে, শা’বানের রাতে উঠে ইবাদত করা হুজুর (সা.) এর বিশেষ অভ্যাস ছিল এবং শুধু ইবাদত নয়, এই রাতে হুজুর (সা.) জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে তাশরীফ নিয়েছেন। কোন কোন লোক এমন ভুল পথে আছে যে, তারা একথা বলে বেড়ায় যে কবরস্থানে যাওয়া এবং ফাতেহা পড়া কোথাও প্রমাণিত নেই। তবে ওদের জবাবে বলা যায় যে, তিরমিযি শরীফের অধ্যায় দ্বারা এটি প্রমাণিত এবং নবী করীম (সা.) এর সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত। এছাড়া সায়্যিদুনা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) উভয়ের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত। এবার সুনানে ইবনে মাজা দ্বিতীয় খÐ পৃষ্ঠা ১০৮ হাদিস নম্বর ১২৩৩। এটিও সিহাসিত্তার অন্যতম কিতাব। এর অধ্যায় হল, শা’বান মাসের পনেরই রাত সম্পর্কে বর্ণনা। সায়্যিদুনা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে হাদিস বর্ণিত যে, যখন পনেরই শা’বানের রাত আসে (যাকে শবে বরাত বলা হয়) হে লোকেরা এই রাতে তোমরা দাঁড়িয়ে নফল নামায পড়তে থাক ইবাদত বন্দেগী কর এবং দিনে রোযা রাখ। কারণ আল্লাহতা’য়ালা এই রাতের শুরু থেকে দুনিয়ার আকাশে এক বিশেষ শানের সাথে অবতরণ করেন এবং ফজর পর্যন্ত বান্দাদেও বখশীশ এবং মাগফিরাতের ঘোষণা দিতে থাকেন। এমনভাবে বলেন, আছো কোন ক্ষমা তলবকারী তাহলে আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। আছো কোন রোজি তলবকারী আমি তাকে রোজি দান করব। আছো কোন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি আমি তাকে আরোগ্য করে দিব। এমনিভাবে বিভিন্ন প্রকারের প্রার্থীদের প্রয়োজনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ফজর পর্যন্ত আপন দান দক্ষিণার হাত বিস্তার করে থাকেন। ( ইবনে মাজা) অন্যান্য রাত এবং পনেরই শা’বানের রাতের মধ্যে পার্থক্য হল এই যে, প্রত্যেক রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তা’য়ালা রহমত নাযিল করেন এবং সে সময় দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বান্দাদের বখশিশের জন্য আহব্বান করতে থাকেন। আর পনেরই শাবানের রাত অর্থাৎ শবেবরাতের বৈশিষ্ট্য হল এই যে, আল্লাহতা’য়ালা সূর্য ডুবার সাথে সাথেই দুনিয়ার আকাশে এক খাছ শানের সাথে তজলি ফরমান এবং ফজর পর্যন্ত বান্দাদের বখশিশ ও মাগফিরাত করতে থাকেন। যখন হাদিসের কোন ইমাম শুধু একটি হাদিসই বর্ণনা করেননি বরং এর উপর অধ্যায় ঠিক করেন এবং এর অধীনে একাধিক হাদিস উল্লেখ করেন, এতে সন্দেহ নেই যে, এর দ্বারা তিনি কেবলমাত্র তাঁর কিতাবের মধ্যে শুধু একটি অধ্যায়ই ঠিক করেননি বরং এটি ছিল ইমাম ইবনে মাজার আক্বিদা ও বিশ্বাস। অনুরূপভাবে ইমাম নাসায়ী ও ইমাম তিরমিযি (র.) এর আক্বিদাহ বিশ্বাসও তদ্রæপ ছিল। তারা স্বয়ং রাতের বেলায় ইবাদত করতেন এবং তা উৎযাপিতও করতেন এবং গুরুত্ব সহকারে ইবাদত বন্দেগি আন্জাম দিতেন। ইমাম ইবনে মাজা (র.) হযরত আবু মুসা আশআরী (রা.) এর সূত্রে হাদিস বর্ণনা করেন, আল্লাহপাক পনেরই শা’বান রাতে দুনিয়ার আকাশে তশরীফ এনে মুশরিক এবং যাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ ও উম্মতের প্রতি শত্রæতা রাখে এরূপ ব্যক্তি ব্যতীত সমস্ত মাখলুককে ক্ষমা করে দেন। উল্লেখিত এবারত সহ হযরত মাআয ইবনে জাবাল (রা.) এর সূত্রে ইমাম তাবারানী (র.) ও ইমাম ইবনে হিব্বান (র.) বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.) আপন সনদে বর্ণনা করেছেন। এবং তিনি হযরত আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। অনুরূপভাবে হযরত আলী মর্তোজা (রা.) থেকেও বর্ণিত আছে। এছাড়া ইমাম বায়হাকী (র.) আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এবং এতে রয়েছে, জিবরিল এসে এরশাদ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এটি পনেরই শা’বানের রাত এটি আপনার জন্য উপঢৌকন স্বরূপ, এই রাত আল্লাহ তাআলা দোযখের আগুন হতে লোকদিগকে মুক্তি দান করেন। ফারসি-উর্দূ ভাষায় উক্ত রাতকে, শবে বরাতের নামে উল্লেখ করা হয়। এটি হল হাদীসে বর্ণিত ‘উতাক্বাউ মিনান্নার’। এর অনুবাদ, এটি প্রিয় নবীজী (সা.) কর্তৃক প্রদানকৃত উপাধী। উক্ত পনেরই শাবান রাতের হাদিস আট জন সাহাবি থেকে বর্ণিত। এ ছাড়া যা বর্ণনা করা হয়েছে এর বিশেষ তাৎপর্য হল মসনদে আহমদ ইবনে হাম্বলের লেখক আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে উক্ত হাদিস বর্ণনা করার পর এর উপর হাদিস সংক্রান্ত গবেষণামূলক আলোচনা করেছেন। উক্ত হাদিস সঠিক বলে তার অনেক স্বাক্ষী আছে। উল্লেখিত হাদিস ইবনে আবি শায়বা শুআবুল ঈমান কিতাবে বর্ণনা করেছেন। যাকে ইমাম বাযযার (র.) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। অতঃপর হযরত আউফ ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেছেন। যাকে ইমাম বাযযা (র.) আট জন সাহাবী থেকেও বিভিন্ন সনদের সাথে বর্ণনা করেছেন। প্রায় পঞ্চাশটি পৃথক পৃথক হাদীসের কিতাবে নিসফে শাবান তথা শবেবরাতের ফযিলত সম্পর্কে হাদিস বর্ণিত আছে। মুহাদ্দিসগণ বলেন, এমন কথা বলা যে অমুক হাদিস যয়ীফ, তমুক হাদীসে দুউফ আছে এগুলি ঠিক নয়। যদি একটি মাত্র সনদের সাথে হাদিস বর্ণিত হয় তবে এক্ষেত্রে কিছু কথা বার্তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কোন একটি সনদ ও বর্ণনা দেখে ধারণা করা ঠিক নয় যে লিখে দিলাম এতে দুউফ বা দুর্বলতা আছে। অনেকের এ কথা ধারণাই নাই যে, দুউফ বা দুর্বলতা কাকে বলে। জাল হাদিসকে যাইফ বলা হয় না। এবং একথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, দুর্বলতা কোন সময়ই হাদীসের মত বা বিষয় বস্তুর মধ্যে হয় না। সনদের মধ্যে কোন কারণে দুর্বলতা আসে। একটি কারণে যদি কোন সনদে দুর্বলতা আসে তবে অপর শক্তিশালী সনদের কারণে এর দুর্বলতা দূর হয়ে যায়। কোন কোন লোক অজ্ঞতাবশতঃ উসুলে হাদিস ও হাদিস শাস্ত্রের ব্যাপারে জ্ঞান না থাকার কারণে তাদের বক্তব্য ও কথাবার্তা দ্বারা সমাজে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়। এগুলো ঠিক নয়। এ ধরনের লোকদের ব্যাপারে উপদেশ হলো, তারা যেন শবে বরাত সম্পর্কে মন গড়া বক্তব্য দিয়ে সমাজে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ করে না দেন, মানুষ মনে করবে শবেবরাত একটি রসম ও রেওয়াজ ছাড়া আর কোন কিছু নয়। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.) এই হাদিস বর্ণনা করার পর বলেন যে, এসব বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত। হযরত আয়েশা (রা.) পৃথক সনদে এটিকে বর্ণনা করেছেন। এই হাদিসকে হযরত মায়ায ইবনে জাবাল (রা.), হযরত আবু মুসা ইশআরী (রা.)ও বর্ণনা করেছেন। এরপর ইবনে হিব্বান (র.)ও বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে আসিম (র.) সায়্যিদুনা হযরত আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বায়হাকী (র.) শুয়াবুল ঈমানের মধ্যে বর্ণনা করেছেন। এরপর ইমাম বাযযার (র.) এটিকে সায়্যিদুনা হযরত আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে খুযায়মা (র.)ও বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়া সাহাবি হযরত আবু সালাবা (রা.)ও বর্ণনা করেছেন, যাকে ইমাম আসিম (র.) কিতাবুস সুন্নাহর মধ্যে বর্ণনা করেছেন। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (র.) যিনি পুরো সৌদি আরবের উলামাদের নিকট বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য বলে পরিচিত, তিনি তার ফতওয়ার ৩০ নম্বর খন্ডের ১৪২ নং পৃষ্ঠায় শবে বরাত সম্পর্কে লিখেন, শাবানের পনেরই রাত যার ফযিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে এবং সাহাবায়ে কেরামদের অনেক আছার তথা তাদের বাণী বর্ণিত আছে। আর এমনিভাবে সলফে সালেহীন, তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীনগণের প্রচুর সংখ্যক ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য এসেছে এবং এ কথা প্রমাণিত যে তারা সে রাতে গুরুত্ব দিয়ে নামাজ ও ইবাদত বন্দেগি করতেন। হজরত ইমাম শাফেয়ী (রা.) বলেন- শবেকদর ব্যতীত পাঁচটি রাত এমন আছে যাতে দোয়া করলে তা ফিরায়ে দেয়া হয় না- ১) জুমার রাত, ২) উভয় ঈদের রাত, ৩) রজব মাসের প্রথম রাত, ৪) শাবানের পনেরই রাত। শায়েখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.) বর্ণনা করেন, মাছাবাতা বিস সুন্নাহ নামক কিতাব অর্থাৎ সে বিষয়বস্তু যা সুন্নত দ্বারা প্রমাণিত অত্র কিতাবে তিনি শাবান ও শবেবরাতের ফযিলত সম্পর্কে পৃথক অধ্যায় ঠিক করেছেন এবং এ বিষয়ে সব ইমাম হাদিস বিশারদগণের ইজমা বর্ণনা করেছেন। হজরত সায়্যিদুনা গাউসুল শায়েখ আব্দুল কাদির জিলানী (র.) যিনি হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন তিনি তাঁর রচিত গুনয়াতুত তালিবীন এর মধ্যে পৃথক অধ্যায় ঠিক করেছেন এবং গুনয়াতুত তালিবীনের ৩৩৯ পৃষ্ঠায় শবেবরাত সম্পর্কে অনেক হাদিস জমা করেছেন। ইমাম জালাল উদ্দিন সায়ুতী (র.) তাঁর রচিত কিতাব আব্দুল মানছুর এর মধ্যে শবেবরাত সম্পর্কে ২৫টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। উক্ত তাফসীরের কিতাবের শেষে আলোচনা প্রসঙ্গে একটি সূ² ঈমান প্রজ্জ্বলিত তথা যা গুনয়াতুত তালিবীন গ্রন্থে আমাদের সকল ওলী আব্দুল, গাউস, কতুবগণের শায়খ সায়্যিদুনা গাউসুল আজম শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (র.) লিখেছেন তা এভাবে বর্ণনা দেন যে, ৫টি অক্ষরের সমন্বয়ে গঠিত (শব্দ সমষ্টি) সায়্যিদুনা গাউসুল আজম (র.) বলেন, শাবানের শীন অক্ষরে আল্লাহতায়ালা মান-সম্মান নিহিত রাখছেন, শাবানের আইন অক্ষরে আল্লাহতায়ালা উচ্চ মর্যাদা ও উন্নতি প্রগতি নিহিত রাখছেন এবং শাবানের বা অক্ষরে আল্লাহতায়ালা পূর্ণ ও তাকওয়া লুকায়িত রেখেছেন আর শাবানের আলিফের মধ্যে আলাহতায়ালা প্রেমপ্রীতি লুকায়িত রেখেছেন এবং শাবানের নুন অক্ষরে আল্লাহতায়ালা নিহিত রেখেছেন। এ ছাড়া তিনি বলেন, এতে খায়রাত খুলে দেয়া হয়, বরকত সমূহ নাজিল হয়। গুনাহ খাতা পরিত্যাগ করা হয় এবং গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেয়া হয় এবং প্রচুর পরিমাণে হুজুর (সা.) এর উপর রহমত হতে থাকে। ইমাম কুসতুলানী (র.) একটি মূল্যবান কথা বলেছেন যে, মুওয়াহিবে লাদুনিয়ার ভাষ্যকর ইমাম যুরকানী (র.) বর্ণনা করেন যে, শাবানের ফযিলতের মধ্যে অন্যতম ফযিলত এটিও আছে যে, এটি সেই মাস যাতে আল্লাহতায়ালা হুজুর (সা.) এর উপর দুরুদ আর সালামের আয়াত নাযিল করেছেন। তিনি বলেন যে, উক্ত আয়াত শাবান মাসে নাযিল হয়েছে কাজেই শাবানের সম্পর্ক হুজুর (সা.) এর দুরুদ আর সালামের সাথে বেশি এবং আল্লাহর বখশিশ, মাগফেরাত ও তওবার সাথেও অনেক বেশি। সুতারাং এ রাতের ইবাদতের দ্বারা প্রিয় নবিজী (সা.) এর দরবারেও নৈকট্য অর্জন হয়, বিশেষ করে আল্লাহতায়ালার দরবারে নৈকট্য অর্জন হয়। আল্লাহ তাবারাকা ও তা’য়ালা যেন আমাদের উক্ত বিষয়ের তত্ত¡ অন্তর্নিহিত সারাংশের বুঝ দান করেন এবং সাথে সাথে উক্ত বরকত এবং নিয়ামতগুলো দ্বারা উপকৃত হওয়ার তৌফিক দান করেন।

তাৎপর্যময় পবিত্র শবে বরাত & শবে বরাত : ফযীলত ও আমল

তাৎপর্যময় পবিত্র শবে বরাত & শবে বরাত : ফযীলত ও আমল পবিত্র শবে বরাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ তাৎপর্যময় রজনী। শবে বরাতকে আরবিতে ‘লাইলাতুল বারাআত’ নামে অভিহিত করা হয়। ‘শব’ ফারসি শব্দ। এর অর্থ রজনী বা রাত, আরবিতে একে ‘লাইলাতুন’ বলা হয়। আর ‘বারাআত’ শব্দের অর্থ মুক্তি, নাজাত, নিষ্কৃতি প্রভৃতি। ‘লাইলাতুল বারাআত’ মানে মুক্তির রজনী বা নিষ্কৃতির রজনী। এ রাতে আল্লাহর খাঁটি বান্দারা মহান সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে মার্জনা লাভ করে থাকেন। তাই এ রাতকে ‘লাইলাতুল বারাআত’ বা শবে বরাত বলা হয়। নবী করিম (সা.) এ রাতকে ‘লাইলাতুন নিস্ফ মিন শাবান’ অর্থাৎ অর্ধ শাবানের রাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মুসলমানদের কাছে শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রজনী অত্যন্ত বরকতময় ও মহিমান্বিত বলে বিবেচিত। আল্লাহ পাক মানবজাতির জন্য তাঁর অসীম রহমতের দরজা এ রাতে খুলে দেন। পরম করুণাময়ের দরবারে নিজের সারা জীবনের দোষ-ত্রুটি, পাপকাজ ও অন্যায়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার রাত। এ রাতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ পরবর্তী বছরের জন্য বান্দার রিজিক নির্ধারণ করে সবার ভাগ্যলিপি লেখেন এবং বান্দার সব গুনাহ মাফ করে দেন। এ রাতের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, পরবর্তী বছরের যাবতীয় ফয়সালা হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত, আমল ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আদেশ-নিষেধসমূহ ওই রাতে লওহে মাহফুজ থেকে উদ্ধৃত করে কার্যনির্বাহক ফেরেশতাদের কাছে সোপর্দ করা হয়। লাইলাতুল বরাতে মুমিন বান্দাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষিত হয়। মানুষের ভালো-মন্দ কর্মের হিসাব বা আমলগুলো আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। শবে বরাতে আল্লাহ তাআলা ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের উত্তরণের পথ দেখান। এ জন্য মুসলমানদের কাছে শবে বরাত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যখন মধ্য শাবানের রজনী উপস্থিত হয়, তখন সেই রাত্রি জাগরণ করে তোমরা সালাতে নিমগ্ন হবে এবং পরদিন রোজা রাখবে। কারণ আল্লাহ তাআলা এ রাতে সূর্যাস্তের পর পৃথিবীর আসমানে অবতরণ করেন এবং তাঁর বান্দাদের ডেকে ঘোষণা দিতে থাকেন—আছে কোনো ক্ষমাপ্রার্থী? যাকে আমি ক্ষমা করব, আছে কোনো রিজিকপ্রার্থী? যাকে আমি রিজিক দেব? আছে কোনো বিপদাপন্ন? যার বিপদ আমি দূর করে দেব? আছে কোনো তওবাকারী? যার তওবা আমি কবুল করব। এভাবে নানা শ্রেণীর বান্দাকে সুবহে সাদেক পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা আহ্বান করতে থাকেন।’ (ইবনে মাজা, মিশকাত) নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘শাবানের ১৪ তারিখের রাতে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষী ব্যক্তি ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (বায়হাকি)। পাপী লোকেরা যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিজ নিজ পাপকাজ পরিত্যাগ করে তওবা না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শবে বরাতেও তাদের জন্য ক্ষমার দ্বার উন্মুক্ত হবে না। শবে বরাত মানুষের নৈতিক চরিত্র গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে বান্দা শবে বরাতের তাৎপর্য অনুধাবন করে সর্বক্ষেত্রে অন্যায় পরিহার এবং ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়। এভাবে ধর্মের প্রতি মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা বহু গুণে বেড়ে যায়। খাঁটি দিলে তওবা তথা অতীত অন্যায়ের জন্য অনুতাপ এবং ভবিষ্যতে তা না করার সংকল্প গ্রহণ করে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করলে তিনি অবশ্য তাকে মাফ করতে পারেন। তাই মুক্তির রজনী হিসেবে লাইলাতুল বরাতের আগমন পাপী-তাপী বান্দাদের জন্য এক অনবদ্য নিয়ামতের ভান্ডার। এ রাতে ইবাদত-বন্দেগির মধ্যে নিমগ্ন থাকাই প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের প্রধান কাজ। এ রাতে তওবা-ইস্তেগফার করা, আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য আকুতি জানানো এবং জীবিত ও মৃতদের পাপরাশি ক্ষমা লাভের জন্য প্রার্থনার উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এ রাতে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, কবর জিয়ারত ও পরদিন নফল রোজা রাখার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সক্ষম হয় এবং ব্যক্তিজীবনে এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটে। নবী করিম (সা.) নিজেও এ রাতে কবর জিয়ারত করতেন এবং ইবাদতে নিমগ্ন হতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শাবান মাসের ১৫ তারিখে রোজা রাখবে, দোজখের আগুন তাকে স্পর্শ করবে না।’ (আবু দাউদ) শবে বরাতে করণীয় আমলের সঙ্গে কতগুলো বর্জনীয় বিষয়ও সম্পৃক্ত আছে। এ রাতে অপব্যয় না করে এবং আতশবাজিতে অনর্থক অপচয় না করে সে অর্থ মানবতার কল্যাণকর কাজে বা গরিব-মিসকিনের মধ্যে দান-সাদকা করা অনেক সওয়াব ও বরকতের কাজ। শবে বরাতে আতশবাজি নয়, বরং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে শবে বরাতের বৈশিষ্ট্য অনুষ্ঠানের আড়ম্বরতার মধ্যে নয়, বরং চরিত্রবলের সাধনার মাধ্যমে দয়াময়ের করুণা লাভের আন্তরিক প্রয়াসই এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। এ রাতে অহেতুক আলোকসজ্জা করা, তারাবাতি জ্বালানো, আতশবাজি পোড়ানো, পটকা ফোটানো প্রভৃতি শরিয়তগর্হিত কাজ। এতে অপসংস্কৃতির সঙ্গে যেমন সাদৃশ্য তৈরি হয়, তেমনি ইবাদতেও যথেষ্ট বিঘ্ন ঘটে। শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের এ বিষয়ে সতর্ক করা অবশ্যকর্তব্য। প্রকৃতপক্ষে শবে বরাত উপলক্ষে এ দেশে ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি হয়। ঈমানদার মানুষের মধ্যে অতুলনীয় এক ধর্মীয় অনুভূতি ও চেতনা পরিলক্ষিত হয়। এ রাতে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করাই বান্দার একমাত্র কর্তব্য। তাই সৌভাগ্য আর রিজিক বরাদ্দের, জীবন-মৃত্যুর দিনক্ষণ নির্ধারণের রজনীতে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে সর্বপ্রকার গোঁড়ামি ও শিরক থেকে পরিত্রাণ লাভের প্রার্থনা করা উচিত। আল্লাহ পাক যেন মুসলিম জাহানের সুখ-শান্তি ও কল্যাণের জন্য তাঁর রহমতের দরজা সারা বছরই খুলে রাখেন—এটাই কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা। *************** ফার্সী ভাষায় ‘শব’ শব্দটির অর্থ রাত। ‘বরাত’ শব্দটি আরবী থেকে গৃহীত। বাংলায় ‘বরাত’ শব্দটি ‘ভাগ্য’ বা ‘সৌভাগ্য’ অর্থে ব্যবহৃত হলেও আরবী ভাষায় এ শব্দটির অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আরবী ভাষায় ‘বারাআত’ শব্দটির অর্থ বিমুক্ত, সম্পর্কছিন্নতা, মুক্ত হওয়া, নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া ইত্যাদি। ফার্সী ‘শবে বরাত’ ও আরবী ‘লাইলাতুল বারাআত’ অর্থাৎ ‘বিমুক্তির রজনী’ বলতে আরবী পঞ্জিকার ৮ম মাস, শাবান মাসের মধ্য রজনীকে বুঝানো হয়। কুরআন ও হাদীসে কোথাও ‘লাইলাতুল বারাআত’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়নি। সাহাবী-তাবেয়ীগণের যুগেও এ পরিভাষাটির ব্যবহার পাওয়া যায় না। এ রাতটিকে হাদীস শরীফে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা ‘ মধ্য শাবানের রজনী’ বলা হয়েছে। একজন মুমীনের জন্য ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা ভিন্ন অন্য কোন পথ নেই। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন- ‘আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে গেলাম। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ঐ দুটি জিনিসকে আঁকড়ে ধরে থাকবে, কখনই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হল, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাত। {মুয়াত্তা মালিক, হাদীস-১৩৯৫} তাই একজন মুমীন কখনই কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনার বাইরে কোন কাজ করতে পারে না। আর করলেও তা কখনও ইবাদত হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শবে বরাতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সমভাবে প্রযোজ্য। শবে বরাতের রাতে যে সকল লোকের আমল কবুল হয় না বলে বর্ণিত হয়েছে, এমন লোকের সংখ্যা প্রায় এগার এক. মুশরিক অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে যে কোন প্রকারের শিরকে লিপ্ত হয় দুই. যে ব্যক্তি কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী তিন. আত্মহত্যার ইচ্ছা পোষণকারী চার. যে ব্যক্তি অপরের ভাল দেখতে পারে না অর্থাৎ পরশ্রীকাতরতায় লিপ্ত পাঁচ. যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, চাই তা নিকটতম আত্মীয় হোক বা দূরবর্তী আত্মীয় হোক ছয়. যে ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয় সাত. যে ব্যক্তি মদ্যপানকারী অর্থাৎ নেশাকারী আট. যে ব্যক্তি গণকগিরি করে বা গণকের কাছে গমণ করে নয়. যে ব্যক্তি জুয়া খেলে দশ. যে ব্যক্তি মাতা-পিতার অবাধ্য হয় এগার. টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী পুরুষ ইত্যাদি ব্যক্তির দুআও তওবা না করা পর্যন্ত কবুল হয় না। তাই শবে বরাতের পূর্ণ ফযীলত ও শবে বরাতের রাতে দুআ কবুল হওয়ার জন্য উল্লেখিত কবীরা গুনাহ সমূহ থেকে খাঁটি দিলে তওবা করা উচিত। অন্যথায় সারারাত জেগে ইবাদত-বন্দেগী করেও কোন লাভের আশা করা যায় না। শবে বরাতের আমল বা করনীয় সম্পর্কে যা জানা যায় তা হল এক. এই রাতে কবর যিয়ারত করা যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই দলবদ্ধ ও আড়ম্বরপূর্ণ না হয়ে একাকী হওয়া উচিত দুই. শবে বরাতের রাত্রিতে নামায-দুআ, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির-আযকার, দরূদ শরীফ ইত্যাদিতে লিপ্ত থাকা ভাল তিন. এই রাত্রিতে দীর্ঘ সিজদায় রত হওয়া উচিত চার. শবে বরাতের পরের দিন অর্থাৎ ১৫ই শাবান রোযা রাখা। তাছাড়া প্রত্যেক আরবী মাসের তের, চৌদ্দ ও পনেরতম তারিখে রোযা রাখা অধিক মর্যাদাপূর্ণ একটি আমল। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে ‘রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, প্রত্যেক মাসে তিনটি রোযা এক বৎসরের রোযার ন্যায়। আর আইয়্যামুল বীয (পূর্ণ চন্দ্রময় রজনীর দিবসসমূহ) হল, তের, চৌদ্দ ও পনেরতম দিবস।’ {নাসাঈ শরীফ, হাদীস-২৩৭৭} তবে, শবে বরাতকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে বেশ কিছু কুসংস্কার ও বিদআত চালু আছে। তম্মধ্যে অন্যতম বিদআত হল হালুয়া-রুটি তৈরী করার এক মহা ধুমধাম। যা নিঃসন্দেহে একটি কুসংস্কার ও বিদআত। তাই, এটি বর্জন করা উচিৎ। সেই সাথে বিভিন্ন কবরস্থানে বা মসজিদে আলোক সজ্জার ব্যবস্থা করাও অপচয়ের গুনাহসহ মস্তবড় একটি বিদআত। সারারাত্রি জাগরণ করে ইবাদত-বন্দেগীর চাইতে শুধু মসজিদে-মসজিদে ঘোরাঘুরি করা আর রাস্তায়-রাস্তায় গল্প-গুজবে মশগুল থাকা এই রাত্রির মর্যাদা পরিপন্থি কাজ। বরং, এই রাত্রিতে মসজিদে সমবেত না হয়ে বাড়িতে একাকী ইবাদত করাই উত্তম। মসজিদে তো দৈনিক পাঁচবার নামাযের ইবাদত হচ্ছেই। নিজেদের বাসা-বাড়িকেও ইবাদতের গৃহ হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। তাছাড়াও সকল নফল ইবাদত মসজিদের চাইতে বাড়িতে পালন করাই উত্তম। সারারাত নফল ইবাদত পালন করে যদি ফজরের নামায কাযা হয়ে যায়, এর চাইতে দূর্ভাগ্য আর কি হতে পারে? যদি কারো জীবনে কাযা নামায থেকে থাকে, তাহলে নফল নামায পড়ার চাইতে বিগত জীবনের কাযা নামায আদায় করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ এবং জরুরী। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে তার কুরআন ও হাদীস সম্মত পন্থায় ইবাদত পালনের তাওফীক দিন। আমীন।