Friday, April 24, 2020

মাহে রমজানের ফজিলত ও তার হুকুম আহকাম

মাহে রমজানের ফজিলত ও তার হুকুম আহকাম ================================== চন্দ্রবর্ষ দিন গণনায় রমজানের দিনগুলো হচ্ছে শ্রেষ্ঠ। এই মাস কল্যাণময় মাস। এ মাস কোরআন নাজিলের মাস। রহমত- বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এ মাস তাকওয়া ও সংযম প্রশিক্ষণের মাস। এ মাস সবরের মাস। এ মাস জীবনকে সব পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি দেয়। এ মাস আল্লাহর নৈকট্য ও রেজামন্দি অর্জনের মাস। আল্লাহপাক পবিত্র কালামে ঘোষণা করেন, রমজান মাস মানুষের দিশারি এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে আল কোরআন নাজিল হয়েছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে, তারা যেন এ মাসে সিয়াম তথা রোজা পালন করে। (সুরা বাকারা)। রমজান আরবি শব্দ 'রমজ' ধাতু থেকে এসেছে। 'রমজ' ধাতুর দুটি অর্থ আরবি অভিধান ও আরবি সাহিত্যে পাওয়া যায়। এর একটি অর্থ হলো দাহন বা পোড়ানো এবং অপরটি আরব দেশের বছরের প্রথম বৃষ্টি। এ মাসের নাম রমজান এ জন্য রাখা হয়েছে যে সর্বপ্রথম যখন এ মাসের নাম রাখা হয়েছিল তখন প্রচণ্ড গরম ছিল। এ জন্য এই মাসের নাম রাখা হয়েছে রমজান। এই পবিত্র মাসকে রমজান এ জন্য বলা হয়, এ মাসে আল্লাহপাক নিজ মেহেরবানিতে সব গুনাহ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেন; মানুষ যেন এক নবজীবন লাভ করতে পারে। এ সম্পর্কে আল্লাহপাক কোরআনুল কারিমে ঘোষণা করেন_হে ইমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল; যাতে করে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। এ কতিপয় নির্দিষ্ট দিনের রোজা। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ রোগগ্রস্ত হয় অথবা মুসাফির, তাহলে সে যেন অন্য দিনগুলোতে এই সংখ্যা পূর্ণ করে। আর যাদের রোজা রাখার সামর্থ্য আছে (এর পরও রাখে না) তারা যেন ফিদ্ইয়া দেয়। একটি রোজার ফিদইয়া একজন মিসকিনকে খাওয়ানো। আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও সানন্দে কিছু বেশি সৎকাজ করে, তা তার জন্য ভালো। তবে যদি তোমরা সঠিক বিষয় অনুধাবন করে থাকো, তাহলে তোমাদের জন্য রোজা রাখাই ভালো! (সুরা বাকারা)। বিনা ওজরে রোজা না রাখার পরিণাম : হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন_যে ব্যক্তি বিনা ওজরে ইচ্ছাপূর্বক রমজানের একটি রোজা ভঙ্গ করেছে, অন্য সময়ের সারা জীবনের রোজা তার সমকক্ষ হবে না। যাদের ওপর রোজা রাখা ফরজ : প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ, মুসাফির নয়_এমন সব মুসলমানের ওপর মাহে রমজানের রোজা পালন করা ফরজ। #রোজা সহিহ হওয়ার শর্ত হচ্ছে : ১. নিয়ত করা, ২. মহিলাদের ঋতুস্রাব অর্থাৎ হায়েজ ও নিফাস থেকে মুক্ত হওয়া, ৩. রোজা বিনষ্টকারী বিষয়াদি থেকে দূরে থাকা। #সেহরি খাওয়া : শেষরাতে সুবহে সাদিকের আগে রোজা রাখার নিয়তে যে খাবার খাওয়া হয় তাকে সেহরি বলে। সেহরি খাওয়া সুন্নত। নবী করিম (সা.) বলেছেন, তোমরা সেহরি খাও। কেননা সেহরিতে বরকত রয়েছে। রোজা ফারসি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে দিন। যেহেতু এই আমলটি দিনের শুরু থেকে শেষাংশ পর্যন্ত পালন করা হয় তাই একে রোজা বলা হয়। আর আরবিতে এর নাম সাওম বা সিয়াম। যার শাব্দিক অর্থ কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস থেকেও বিরত থাকার নাম রোজা। ইসলামী বিধান অনুসারে, প্রতিটি সবল মুসলমানের জন্য রমজান মাসের প্রতিদিন রোজা রাখা ফরজ বা অবশ্য পালনীয়। #রোজার_নিয়ত نويت ان اصوم غدا من شهر رمضان المبارك فرضا لك ياالله فتقبل منى انك انت السميع العليم (নাওয়াইতু আন আছুমা গাদাম মিন শাহরি রমাজানাল মুবারাকি ফারদাল্লাকা, ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম।) অর্থ: হে আল্লাহ! আগামীকাল পবিত্র রমযান মাসে তোমার পক্ষ হতে ফরয করা রোজা রাখার নিয়ত করলাম, অতএব তুমি আমার পক্ষ হতে কবুল কর, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী। #ইফতার : পূর্ণদিবস রোজা পালনের পর সূর্যাস্তের পরপর আহার গ্রহণের মাধ্যমে রোজার যে পরিসমাপ্তি করা হয় তাকে ইফতার বলে। খেজুর দ্বারা ইফতার করা সুন্নত। তা না থাকলে পানি দ্বারা ইফতার করা মুস্তাহাব। সূর্যাস্তের পর বিলম্ব না করে ইফতার করা সুন্নত। #ইফতারের_দোয়া اللهم لك صمت و على رزقك افطرت. (আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিযক্বিকা ওয়া আফতারতু বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমীন।) অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমারই সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেয়া রিযিক্ব দ্বারা ইফতার করছি। #যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ করা জায়েজ এবং পরবর্তী সময়ে কাজা আদায় করতে হয় : ১. অসুস্থতার কারণে রোজা রাখার শক্তি না থাকলে কিংবা রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকলে অথবা সুস্থতা লাভে বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে রোজা ভঙ্গ করা জায়েজ। ২. অন্তঃসত্ত্বা নারী ও স্তন্যদানকারিণী নারী যদি রোজা রাখেন, তাহলে তাঁর কিংবা তাঁর সন্তানের প্রাণনাশের অথবা অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে তাঁর জন্য রোজা ভঙ্গ করা জায়েজ। ৩. মুসাফিরের রোজা না রাখা কিংবা ভঙ্গ করার অনুমতি আছে। #যেসব কারণে রোজা নষ্ট হয় এবং কাজা ও কাফ্ফরা ওয়াজিব হয় : ১. সঙ্গম করা। ২. পানাহার করা, তা কোনো খাবার হোক অথবা কোনো ওষুধ হোক। ৩. বৃষ্টির ফোঁটা মুখের ভেতর পড়ার পর তা স্বেচ্ছায় গিলে ফেলা। ৪. স্বেচ্ছায় ধূমপান করা। ৫. একটি গম কিংবা ওই পরিমাণ কোনো কিছু গিলে ফেলা। #যেসব কারণে রোজা নষ্ট হয় এবং শুধু কাজা ওয়াজিব হয় : ১. কোনো দৈহিক ওজরের কারণে পানাহার করা। তেমনিভাবে ভুলক্রমে পানাহার করার পর রোজা নষ্ট হয়েছে মনে করে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু পানাহার করা। ২. নাক ও কানের ভেতর ওষুধ ব্যবহার করা। ৩. মলদ্বার দিয়ে ওষুধ প্রবেশ করানো। ৪. খাদ্যদ্রব্য নয় এমন কিছু, যেমন_খেজুরের আঁটি, তুলা, কাগজ, লোহা, কংকর, মাটি অথবা এর টুকরা ইত্যাদি গিলে ফেলা। ৫. কুলি করার সময় পানি গলার ভেতরে চলে যাওয়া। ৬. কানের ভেতর তেলের ফোঁটা কিংবা পানির ফোঁটা দেওয়া। ৮. রাত শেষ হয়নি মনে করে সুবহে সাদিক হওয়ার পর কোনো কিছু আহার করা অথবা স্ত্রী সহবাস করা। ৯. দাঁতের মধ্য থেকে ছোলা পরিমাণ কিছু বের করে খাওয়া। #যেসব কারণে রোজা মাকরুহ হয় : ১. অপ্রয়োজনে কোনো জিনিসের স্বাদ আস্বাদন করা কিংবা চিবানো। ২. পরনিন্দা করা। ৩. ঝগড়া-ফ্যাসাদ করা। ৪. পূর্ণদিবস নাপাক অবস্থায় থাকা। ৫. টুথপেস্ট, মাজন কিংবা কয়লা দিয়ে দাঁত মাজা। ৬. মুখে থুথু জমিয়ে রেখে গিলে ফেলা। মাহে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর আমল ও নির্দেশে অপরিসীম গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। হজরত তালহা বিন উবায়দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা জনৈক বেদুঈন নবী করিম (সা.)-এর কাছে এল। তার মাথার চুল ছিল ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। সে বলল, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.), আমাকে বলুন আল্লাহ আমার ওপর কত ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। তখন তিনি বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত। কিন্তু যদি নফল নামাজ পড় তাহলে তা স্বতন্ত্র কথা। অর্থাৎ সেগুলোর সওয়াব ভিন্নভাবে পাবে। লোকটি বলল, আমাকে বলুন আল্লাহপাক আমার ওপর কতটা রোজা ফরজ করেছেন? নবী করিম (সা.) বললেন, গোটা রমজান মাসের রোজা ফরজ। কিন্তু তুমি যদি নফল রোজা রাখ তা হবে স্বতন্ত্র কথা। লোকটি আবার বলল, আমাকে বলুন আল্লাহ আমার ওপর কী পরিমাণ জাকাত ফরজ করেছেন? এবার প্রিয় নবী (সা.) তাকে ইসলামের আইনকানুন ও বিধিবিধান জানিয়ে দিলে সে বলল, সেই মহান সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য বিধান দিয়ে সম্মানিত করেছেন। মহান আল্লাহপাক আমার ওপর যা ফরজ করেছেন, আমি তার অধিকও কিছু করব না, আর কমও কিছু করব না। (বুখারি শরিফ)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, যখন রমজান মাস আসে তখন আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। অপর বর্ণনায় রয়েছে, বেহেশতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানকে বন্দি করা হয় এবং রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় (বুখারি ও মুসলিম)। রমজানের রোজা মানুষের সব গুনাহ ও পাপ প্রবণতা, অন্যায় ও অসৎ মানসিকতা, পাশবিক কামনা-বাসনা এবং আত্মার সব ধরনের কলুষতাকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে রোজাদারকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে। এই মাসের ইবাদতের মাধ্যমে রোজাদাররা আল্লাহর সন্তুষ্টি, আল্লাহর ক্ষমা প্রদর্শন, আল্লাহর জিম্মাদারি, আল্লাহর ভালোবাসা ও আল্লাহর নিয়ামত লাভ করে থাকেন। আল্লাহ আমাদের রোজার পূর্ণাঙ্গ হক আদায়সহ রমজানের দিনগুলোর রোজা পালনের তাওফিক দান করুন। #মাহে রমজানের জরুরি মাসাইল মহান আল্লাহ তা’য়ালা অত্যান্ত দয়াপরবশ হয়ে মুমিন বান্দাদেরকে দান করেছেন সসীম রহমত, সীমাহীন বরকত ও পুণ্যে ভরা মওসুম পবিত্র রমজানুল মোবারক। আল্লাহ তা’য়ালার নিয়ম অনুযায়ী কোন মাসকে অন্য মাসের উপর, কোন দিবসকে অন্য দিবসের উপর শ্রেষ্টত্ব দান করেছেন। আর পবিত্র রমজানুল মোবারক হলশ্রেষ্টত্ব মাসের মধ্যে অন্যতম একটি মাস। এ মাসে রাত-দিন সর্বদা মুমিনদের উপর রহমত বর্ষিত হয়। আমলের সওয়াব বহুগুণে বর্ধিত হয়। জান্নাতের দুয়ার খুলে দেয়া হয়। জাহান্নামের দুয়ার বন্ধ করে দেয়া হয়। পাপিষ্ট শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। রহমত, মাগফিরাত ও মহামুক্তি দেয়া হয় বান্দাদের। রমজানে রয়েছে শবে কদরের রাত, যা সহস্র মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এসব বৈশিষ্ট্যের অপূর্ব সমাহার মাহে রমজান। এক কথায় বলা যায় পূণ্য ও ইবাদতের উর্বর মওসুম হলো পবিত্র রমজান। ইবাদতের এ উর্বর সময়কে বান্দা যথায ঐকান্তিকতার সাথে কাজে লাগাতে পারলে সামান্য সাধনা, ক্ষুদ্র পরিশীলনী ও অনুশীলনী দ্বারা প্রশান্তির বারিধারায় স্নাত হয়ে হাসিল করতে পারে মহান আল্লাহর মহাসন্তুষ্টি। #রোজার পরিচয় ও রমজান শব্দের বিশ্লেষন: রমজান শব্দটি আরবী। ‘রমজুন’ শব্দ থেকে উৎগত হয়েছে। শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, জ্বালিয়ে দেওয়া, ভষ্মীভুত হওয়া ইত্যাদি। যেহেতু রোজা পালনের মাধ্যমে মানুষের মনের ক্রোধ, কু-প্রবৃত্তি, হিংসা-বিদ্বেষ সব কিছু ভষ্মীভুত হযে যায় তাই রোজার এ মাসকে রমজান মাস বলা হয়। রোজা হচ্ছে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি স্তম্ভ। রোজার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, বিরত থাকা। পরিভাষায় রোযা বলা হয় মহান আল্লাহর ফরয নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে সওয়াবের প্রত্যাশায় সুুবহে ছাদেক থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া ও যাবতীয় পানাহার, স্ত্রী সঙ্গে সহবাস তথা যৌনাচার ইত্যাদি প্রভৃতি হতে বিরত থাকাকেই রোজা বলে। মহান আল্লাহ তায়ালা দ্বিতীয় হিজরীর শা’বান মাসে ‘মদীনাতুল মুকাররামায় রমজান মাসের রোজা ফরয করেছেন। #রোজার ফজিলত: মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআন কারিমে ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে করে তোমরা মুত্তাকি হতে পার’। (-সুরা বাকারা-১৮৩) এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, রমজান মাস, যাতে কুরআন নাযিল হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়েত এবং সুপথ প্রাপ্তির সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর হক্ব-বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী। সুতরাং তোমাদের যে কেউ এ মাস পাবে সেযেন অবশ্যই এর রোযা রাখে। (-সূরা বাকারা ১৮৫) হাদসি কুদসিতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘আসসাওমু-লী ওয়া আনা আজযী’ অর্থাৎ রোজা আমার জন্য এবং আমি তার প্রতিদান দেব। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, রমজান মাস শুরু হলেই রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া , জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া এবং শয়তানদেরকে শিকলে আবদ্ধ করা হয়’। (বুখারী হাদিস নং. ১৮৯৮) হজরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা রমযান মাসের প্রত্যেক দিবস ও রাত্রিতে অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। এবং প্রত্যেক মুমিন বান্দার একটি করে দুআ কবুল করেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৭৪৫০) হযরত কা’ব ইবনে উজরা রা. হতে র্বর্ণত, তিনি বলেন- একদা রাসূলুল্লাাহ সা. আমাদেরকে বললেন, তোমরা মিম্বরের নিকট সমবেত হও। আমরা সকলেই তথায় উপস্থিত হলাম। যখন তিনি মিম্বরের প্রথম সিাড়ঁতে পা রাখলেন,তখন বললেন, আমীন, যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখলেন বললেন, আমীন, যখন তিনি তৃতীয় সিঁড়ীতে পা রাখলেন বললেন, আমীন। হযরত কা’ব ইবনে উজরা (রা.) বলেন, যখন তিনি (মিম্বর থেকে) অবতরণ করলেন, আমরা জিজ্ঞেসকরলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আজ আমরা (মিম্বরে উঠার সময়)আপনাকে এমন কিছু কথা বলতেশুনেছি, যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। উত্তরে তিনি বললেন, জিব্রীল আ. আমার নিকট আগমনকরেছিলেন, যখন আমি প্রথম সিড়িঁতে পা রাখলাম, তখন তিনি বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যেরমযান মাস পেল, তবুও তার গুনাহ মাফ হল না। আমি বললাম, আমীন। যখন দ্বিতীয় সিড়িঁতে পা রাখলাম তখন বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যার নিকট আপনার নাম উচ্চারিত হল অথচ সে আপনার প্রতি দরূদ পাঠ করল না। আমি বললাম আমীন। যখন তৃতীয় সিড়িঁতে পা রাখলাম, তখন বললেন, ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি যে বৃদ্ধ পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেল অথচ তারা উভয় তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারল না। অর্থাৎ তাদের খেদমতের মাধ্যমে নিজেকে জান্নাতবাসী করতে পারল না। আমি বললাম, আমীন। (-মুসলিম, হাদীস-২৫৫১ ও তিরমিযী,হাদীস-৩৫৪৫) হযরত আবু হুরয়রা (রা.) বলেন, রমযান মাস লাভকারী ব্যক্তি-যে উত্তমরূপে সিয়াম ও কিয়াম (রোযা, তারাবী ও অন্যান্য আমল) পালন করে-তার প্রথম পুরস্কার এই যে, সে রমযান শেষে গুনাহ থেকে ঐ দিনের মতো পবিত্র হয় যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। (-মুসলিম, হাদীস-৮৯৬৬) হযরত সালমান ফারসী (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, মহানবী (সা:) শা’বান মাসের শেষ দিন আমাদেরকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা মনযোগ দিয়ে শোনে রাখ, তোমাদের সামনে এমন একটি মাস সমাগত। যে মাস মহা পবিত্র, রহমত-বরকত ও নাজাতে ভরপুর। এই মাসের রোযাকে আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের উপর ফরজ করেছেন। যে লোক এই মাসে আল্লাহর সন্তুষ ও তার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে রোযা রাখবে আল্লাহ তার পূর্ববর্তী সমস্ত গোনাহ মাফ করে দিবেন। (- বুখারী শরীফ) যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করবে সে সত্তর টি ফরযের সওয়াব পাবে, আর যে ব্যক্তি একটি সুন্নাত আদায় করবে সে একটি ফরযের সওয়াব পাবে, আর যে একটি নফল আদায় করবে সে একটি সুন্নাতের সওয়াব পাবে। এই মাসে আল্লাাহ তা’য়ালা পূণ্যকে বর্ধিত করতে থাকেন। এই মাসে যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে আল্লাহ তা’য়ালা তার গুনাহ মাফ করে দিবেন, আর সে ব্যক্তিকে রোযাদারের সওয়াব দিবেন। কিন্তু সে জন্য প্রকৃত রোযাদারের সওয়াবের মধ্যে কোন কমতি করা হবে না। (বুখারি) মহনবী সা:) ইরশাদ করেন, ‘আসসাওমু জুন্নাতুন মিনাননার’ অর্থাৎ রোযা প্রকৃত ঈমানদারের জন্য ঢাল সরূপ। (-মিশকাত শরীফ)। মহানবী (সা:) ইরশাদ করেন, ‘রমজান মাসের প্রথম রাত উপনীত হলেই মহান আল্লাহ তা’য়ালা শয়তানও দুষ্ট জ্বিনগুলোকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেন এবং জান্নাতের দরজা খুলে দেন’। (- তিরমিযি শরীফ) হযরত সাহল (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা:) ইরশাদ করেন কিয়ামতের দিন রোযাদারদের জন্য বেহেশতের একটি দরজা ‘রাইহান’ যা দিয়ে তাদেরকে সর্ব প্রথম প্রবেশ করতে দেওয়া হবে। রোযাদার ছাড়া আর কেউ উক্ত দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (-তিরমিযি শরীফ) হযরত যায়েদ ইবনে খালেদ আলজুহানী রা. হতে বর্ণিত, রাসুল( সা.) আলাইহি ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে ইফতার করাবে, সে তার (রোযাদারের) অনুরূপ প্রতিদান লাভকরবে। তবে রোযাদারের প্রতিদান হতে বিন্দুমাত্রও হ্রাস করা হবে না। (- তিরমিযী, হাদীস-৮০৭) হযরত আবু হুরায়রা (রা:) হইতে বর্ণিত নবী করিম (সা:) ইরশাদ করেন, রোযাদারের মুখের দূর্গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকে আম্বরের সুগন্ধের চেয়েও অনেক উৎকৃষ্ঠ’। (-বুখারী শরীফ) #মাহে রমজানের ফজিলত: ক.রমজান মাসে মানবতার মুক্তির সনদ ‘মহাগ্রন্থ আল কুরআন কারীম’ অবতীর্ণ হয়েছে। খ. এ মাসেই তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে আহলে হকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তম্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘বদরের যুদ্ধ’, ‘ফাতহে মক্কা’তথা মক্ক বিজয় ইত্যাদি। গ. এ মাসে হযরত ইব্রাহিম (আ:) সহিফা লাভ করেছিলেন। ঘ. এ মাসে হযরত ইসা (আ:) ইঞ্জিল কিতাব লাভ করেন। ঙ. হযরত দাউদ (আ:) যাবুর কিতাব লাভ করেন । মাসাইলে রোযা: রোযার সংজ্ঞা: সুবহে ছাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইবাদতের নিয়তে যাবতীয় পানাহার ও স্ত্রী সহবাস হতে বিরত থাকার নামই রোযা। প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক, জ্ঞান সম্পূন্ন মুসলমান নর-নারীর উপর রমজানের রোযা ফরজ। তবে মহিলাদের ঋতুস্রাব (মাসিক) ও নেফাস গ্রস্থ থাকা কালীন সময়ে মহিলাদের জন্য রোযা রাখা ফরয নয়। তবে পরবর্তী সময়ে রোযার কাযা আদায করতে হবে। #রোযার নিয়ত: রমজানের রোযার জন্য পৃথক ভাবে নিয়ত করা জররি। রোযার নিয়ত রাত্রেই করে নেয়া ভাল। সূর্য ঢলার দেড় ঘন্টা পর্যন্ত রমজানের রোযার নিয়ত করা যেতে পারে। নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়। কেবল মনের ইচ্ছা তথা রোযা রাখার সংকল্প করাকেই নিয়ত বলে গণ্য হবে। #সাহরী: সাহরী খাওয়া সুন্নাত। অনেকেই অলসতা করে সাহরী না খেযে রোযা রেখে ফেলে, এটা ঠিক নয়। সাহরী খাওয়ার মধ্যে অনেক বরকত ও সওয়াব রয়েছে। রাতের শেষ ভাগে সাহরী খাওয়া উত্তম, তবে এর আগে খেয়ে নিলে কোন অসুবিধা নেই। #ইফতার: সূর্য অস্তমিত হয়ে যাওয়ার পর ইফতার করা উত্তম। অনেকে ইফতারের সময় হওয়ার পরেও ইফতার করতে বিলম্ব করে। সময় হওয়ার পর বিলম্ব করে ইফতার করা মাকরুহ্। আবার অনেকেই ইফতার না করে আগে নামায পড়ে তার পর ইফতার করে এটাও মাকরুহ্, বরং আগে ইফতার তার পরে নামায পড়াা উত্তম। সম্ভব হলে খেজুর দ্বারা ইফতার করা। #তারাবীহ: রমজান মাসে তারাবীর নামায বিশ রাকাত পড়া প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষ সকলের জন্য সুন্নতে মুআক্কাদা। অনেকে রোযা রাখে ঠিক কিন্তু তারাবীর নামায পড়তে অলসতা করে। পুরষদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে তারাবীর নামায পড় ওয়াজিব। #রোযা ভাঙ্গার কারণ: ইচ্ছকৃত মুখ ভরে ভুমি করা। খুলি করা অথবা নাকে পানি দেওয়ার সময় গলার মধ্যে পানি চলে যাওয়া এবং তা গিলে ফেলা। সহবাস ছাড়া অন্য কোন পন্থায় বির্যপাত ঘটানো । ধুমপান করা রাত আছে মনে করে সুবহে ছাদিকের পর পানাহার করা। ভুলবশত পানাহার করে রোযা ভেঙ্গে গেছে মনে করে ইচ্ছা করে পানাহার করা । আগরবাতি বা সুগন্ধি ইচ্ছা পূর্বক নাক দিয়ে ঘ্রান নেয়া। াকানে ও নাকে ওষুধ দেয়া। #যে কারণে কাযা ও কাফফারা উভয়টি ওয়াজিব: রোযা রাখা স্মরণ অবস্থায় কোন পানাহার বা স্ত্রী সাথে সহবাস করা। তা হলে এমতাবস্থায় কাযা ও কাফফারাহ উভয়ট ওয়জিব। #যে সকল কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না: মিসওয়াক করা । চোখে সুরমা লাগানো ্ স্বপ্নদোষ হওয়া। দাত হতে রক্ত বাহির হওয়া। জুনবী তথা নাপাক অবস্থায় সেহরী খাওযা। চোখে ওষুধ লাগানো। ভুলবশত পানাহার করা। অনিচ্ছাকৃতভারেব অল্প ভুমি হওয়া। #যে সকল কারণে রোযা মাকরুহ: মুখে থুথু জমা করে গিলে ফেলা। টুথপেষ্ট দিযে দাত ব্রাশ করা। কয়লা মাজন দ্রব্য দিয়েদাত মাজা । নাপাক অবস্থায় গোসল ছাড়া সারাদিন থাকা। স্ত্রীর সাথে হাসি টাট্টা করা যাতে সহবাস বা বির্যনির্গত হওয়ার আশংকা হয়। রোযা রাখা অবস্থায় গোনাহের কাজ করা ্ অযথা কোন জিনিস চিবানো। গিবত করা। চুগলখোরী করা। অশ্লীল কথাবার্তা বলা। সিঙ্গা লাগানো। #এ’তেকাফ: রমজানের শেষ দশকে মহল্লার জামে মসজিদে এ’তেকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কেফায়া। যে ব্যক্তি এখলাছের সাথে এ’তেকাফ করবে তার পিছনের সমস্ত গোনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন। এ’তেকাফরত অবস্থায় প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না। প্রয়োজনে প্রশ্রাব পায়খানা, জানাবতের গোসল ও জরুরত পরিমাণ বের হতে পারবে। #শ’বে কদর: রমজানের ২১,২৩,২৫,২৭ ও ২৯ তথা শেষ দশকের বেজোর যে কোন রাত সমূহে শ’বে কদর তালাশ করা। বেজোড় যে কোন রাত শ’বে কদর হতে পারে। শ’বে কদরের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আল্লাহ তা’য়ালা এ রাত্রিকে ‘ভাগ্য নির্ধারণী’ রাত বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ সম্পর্কে সুরায়ে ‘কাদর’ নামে একটি সুরা নাযিল করেছেন। হাজার রাতের ইবাদতের চেয়ে উত্তম বলে এ রাত্রিকে আখ্যায়িত করেছেন। এ রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিব্রীল আ.) তাদের পালনকর্তার আদেশক্রমে প্রত্যেক কল্যাণময় বস্তু নিয়ে পৃথিবীতে অবতরন করেন। যে রাত পুরোটাই শান্তি যা ফজর হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।-সূরা কদর (সূরা কাদর: ৩-৫) শেষ কথা, রমজান মাসের প্রতিটি মুহুর্তই ঈমানদার মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। তাই মুমিনের উচিত মহিমান্বিত রমজান মাসকে যথায ইবাদত-আমলের মাধ্যমে অতিবাহিত করা।

No comments:

Post a Comment